আমি ওয়াহিদ ইবনে রেজা,মেথড স্টুডিও এর প্রোডাকশন ম্যানেজার
আমি যেভাবে কাজ করি

Shares

নাম এবং পেশা

ওয়াহিদ ইবনে রেজা , মেথড স্টুডিও এর প্রোডাকশন ম্যানেজার।

নিজেকে কিভাবে পরিচয় দিতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করবেন – একজন অ্যাক্টর, রাইটার,ফিল্ম মেকার , নাকি মেথড স্টুডিও এর প্রোডাকশন ম্যানেজার ?

আমি নিজেকে সব সময় বলি আমি একজন স্টোরি টেলার। আমি যখনই যে কাজটা করেছি স্টোরি টেলার পয়েন্ট অব ভিউ থেকে করার চেষ্টা করেছি।

এখন যে প্রোডাকশন ম্যানেজার হিসেবে কাজ করছি সেই ভিজ্যুয়াল এফএক্স এর কাজটাও কিন্তু একটা গল্পকে সঠিকভাবে ফুটিয়ে তোলা। ভিজ্যুয়াল এফ এক্স দিয়ে একটি কল্পনার চরিত্রকে বাস্তবে ফুটিয়ে তুলতে সাহায্য করে। পিছনের গল্পটাকে বলতে সুবিধা করে। তাই আমি কবিতা লিখি, অভিনয় করি, শর্ট ফিল্ম বানাই, গল্প লিখি, বা ভিজ্যুয়াল এফ এক্স এ ম্যানেজারগিরি করি, যখন যেটাই করি না কেন একটা গল্প বলার চেষ্টা করি বা গল্প বলতে সাহায্য করি।

আপনার এই পেশায় আসার পিছনের গল্পটা যদি আমাদের সাথে শেয়ার করতেন।

আমি তখন বুয়েটে পড়ি। সাধারণত বুয়েট এ পড়া অবস্থায় সবাই ছাত্র/ছাত্রী পড়ায়। আমার এটা ভালো লাগতো না। আমার জীবনের একটা লক্ষ্য ছিল উন্মাদ এ জব করবো। চেষ্টা করলাম, স্টাফ রাইটার হিসেবে জয়েন করার সুযোগ পেলাম।  পরে দেশ ছেড়ে আসার সময় এসোসিয়েট এডিটর ছিলাম সেখানে। উন্মাদ এ পার্ট টাইম কাজ করার পাশাপাশি মঞ্চ নাটক করতাম। অনেকগুলো শো করেছি। মহিলা সমিতি, পাবলিক লাইব্রেরি এবং নাট্য মণ্ডলে। আমাদের একটি দল ছিল “স্বপ্ন” নামে। মাসে একটা দুইটা শো করতাম।

মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং ২য় বর্ষে পড়ি যখন, তখন মেকানিক্যাল ফেস্টিভ্যালের জন্য হ্যান্ডি ক্যাম দিয়ে একটি সিনেমা বানাই। আমি স্ক্রিপ্ট লিখি আর অভিনয় করি। মিনি ডিভি ক্যাসেট দিয়ে করা হয়েছিল। খুব ঘটা করে মাইকিং করেছিলাম রিক্সা ভাড়া করে। মানুষজন খুব অবাক হয়ে দেখতো। সিনেমার নাম ছিল “N পুরুষের প্রেম”। নায়িকা হিসেবে ছিলেন জুলি আপু, সিঙ্গার বালাম ভাইয়ের বোন। যিনি নিজেও খুব ভাল গান করেন আর দুজন ডিরেক্টর এর একজন ছিলেন এসএসডি টেক এর সিএফও জুয়েল ভাই।

এখনকার সময় চিন্তা করলে তেমন কিছুই ছিলনা আমাদের। ভালো সাউন্ড ছিলনা, ভালো ক্যামেরা ছিলনা। তারপরও মঞ্চস্থ করার পর ব্যাপক সাড়া পেলাম। লোকজন হেসে গড়াগড়ি খেল। দেখে অনেক ভালো লেগেছিল সেদিন।

মানুষের এতো ভালো সাড়া পেয়ে উৎসাহ পেয়েছিলাম। ঠিক করছিলাম লেখালিখি চালিয়ে যাবো। একমাত্র সন্তান হিসেবে বাসায় বলার উপায় ছিল না যে আমি ইঞ্জিনিয়ার হতে চাই না, রাইটার হতে চাই। তবে, পড়াশুনা ছাড়িনি, বরং লেখালিখি চালিয়ে গিয়েছি। পাশ করার পর বাসায় বললাম ইঞ্জিনিয়ার না হয়ে রাইটার হব। আব্বুজি আর  আম্মু তো  হতভম্ব। বাসায় কেউ আসলে আমি কি করি সেটা জিজ্ঞাসা করলেই তারা বলতো মাত্র পাশ করে বের হইসে। রাইটার হবার কথাটা বলতে চাইতো না।

সেই থেকে শুরু, পাশ করার কিছুদিন পর কপি রাইটার এর কাজ করলাম। মাঝে মাঝে টিভি তে নাটক লিখতাম, কপি হেড হিসেবে ছিলাম “গ্রে” কোম্পানি তে। প্রচুর বিজ্ঞাপন, প্রচুর নাটক লিখলাম ও অভিনয় করলাম।

আমার ফিল্ম মেকিং শিখাটা প্ল্যান ছিল তাই সেই বিষয়ে পড়াশোনার ঝোঁক ছিল। নর্থ আমেরিকা তে আসার ইচ্ছা ছিল কারণ, হলিউড এ কাজ করার প্ল্যান ছিল মুলত। কিন্তু পড়াশুনার খরচ এর কথা চিন্তা করে পারলাম না। পরে কানাডা তে চেষ্টা করি। এখানে টিউশন ফি কম আর ভেনক্যুবার এর ঠাণ্ডা খুব বেশী না হওয়ায় ব্রিটিশ কলাম্বিয়া তে ফিল্ম মেকিং এর উপর আরেকটা ব্যাচেলর করার জন্য চলে আসি। ডিগ্রি শেষ করার আগেই ৮-৯ টা শর্ট ফিল্ম বানিয়ে ছিলাম। পাশ করার পর জানলাম যে স্থানীয় না হলে আমি ইউনিয়নের মেম্বার হতে পারবনা। আর সেই মেম্বার না হলে কোন প্রোডাকশনে  আমাকে নিবে না।

পাশ করার পর ইন্টার্নশিপ এর জন্য আবেদন করার পর একটা কোম্পানি আমাকে বিনা পয়সায় ইন্টার্ন নেয়ার ব্যাপারে রাজি হয়। ইন্টারভিউতে বাংলাদেশে যে সকল কাজ করেছিলাম সব কিছুর কথা বললাম। তারা বেশ অবাক হয়। আমি কেন সেগুলো রেজ্যুমে তে উল্লেখ করিনি জানতে চায়। ক্যানাডার কোন কোম্পানি অন্য দেশের অভিজ্ঞতা কে গুরুত্ব খুব কম দেয় তাই সেটা আমি উল্লেখ করিনি সেটাও বললাম। তারপর সব শেষে বললাম, বিনে পয়সায় ইন্টার্নশিপ করতে আমার আপত্তি নেই তবে আমার কাজ দেখো যদি সব কিছু মিলিয়ে আমার কাজ ভালো লাগে আমাকে যেন তারা হায়ার করে।

আমার মনে আছে সেদিন দুপুর ২ টার দিকেই তারা আমাকে ফোন দেয় এবং জানায় তারা আমাকে বিনা বেতনে নয় বরং তাদের নিয়মিত এমপ্লয়ি হিসেবে আমাকে নিতে চায়। আমি তখন প্রোডাকশন অ্যাসিস্ট্যান্ট হিসেবে জয়েন করি। সেই থেকেই শুরু।

কোথায় থেকে আপনি প্রতিদিন কাজ  করার উৎসাহ পান?

মানুষ সাধারণত খুব সহজেই কোন কাজের প্রতি উৎসাহ হারিয়ে ফেলে। এইটা স্বাভাবিক। আমি প্রতি ঘণ্টায় ঘণ্টায় উৎসাহ হারিয়ে ফেলি। তবে যে ব্যাপারটি এই ধরনের উৎসাহ জাগিয়ে রাখতে সাহায্য করে সেটি হল আমার এন্ড গোল। যেমন, আমার এন্ড গোল হল নিজের একটি সিনেমা বানানো। এবং যতদিন সেটা না হবে আমি শান্তি পাবো না এবং আমি কাজ করে যাবো। সেটা যত কঠিনই হোক। মানুষ দেখুক আর না দেখুক। এই এন্ড গোল সেট করে কাজ করার ব্যাপারটা আমাকে অনেক উৎসাহ দেয়।

আমি আরও বেশী উৎসাহিত হই যখন দেখি বাংলাদেশী কেউ ভালো কোন কাজ করে। যেমন, বাংলাদেশী একটা ছেলে গ্র্যামি এ্যাওয়ার্ড এর জন্য শর্ট লিস্টেড হয়েছে। আমাদের এক বড় ভাই একটি অর্গানাইজেশন চালাচ্ছে “মানুষ মানুষের জন্য” নামে। এইসব খবর দেখলে বা পড়লে আমার খুব উৎসাহ জাগে কাজ করার।

বাংলাদেশ এর জন্য এই  ভিজুয়্যাল এনিম্যাশন মার্কেট টা আপনি কেমন মনে করেন? বাংলাদেশ কি এখনও সেইরকম ভাবে তৈরি হয়েছে ?

বাংলাদেশ একটি বিশাল সম্ভাবনার দেশ এবং এখানে ভিজুয়াল মার্কেটটা তৈরি হওয়া উচিত। একটা দুইটা কোম্পানি শক্ত ভাবে দাঁড়ালেই এ সেক্টর এর একটা ফ্লো চলে আসবে। আমাদের পাশের দেশ ইন্ডিয়া তে প্রায় ২ বিলিয়ন ডলার এর মার্কেট। তাদের সাথে তুলনা করলে আমরা অনেক পিছিয়ে! অথচ দক্ষ জনবল কিন্তু আমাদের আছে। বা তৈরি করা সম্ভব। দেশের বাইরে যে কোন বড় কোম্পানি তে বাংলাদেশীরা খুব ভালো দক্ষতার সাথে কাজ করে যাচ্ছে।

তবে বাইরের দেশে ভিজুয়্যাল এনিম্যাশন এর কাজের মার্কেট অনেক অগ্রসর একটা কারণে, তাদের কিছু নীতিমালা আছে যেটা এই ধরনের কোম্পানির কাজ গুলো কে সহজ করে দেয়।

কানাডা তে এই ধরনের স্টুডিও এতো বেশী হবার কারণ হল এরা ৮০% ট্যাক্স রিটার্ন পায়। এইটা অনেক বড় একটা সুবিধা। বাংলাদেশে এই ধরনের কিছু নীতিমালা হয়ে গেলে বা করতে পারলে এই সেক্টর এ আমরাও পিছিয়ে থাকবো না।

দরকার শুধু ২ টা জিনিসের।

এক, সঠিক প্রশিক্ষন সুবিধা।

দুই, সঠিক বিনিয়োগ ভিত্তিক স্টুডিও।

আপনার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কি? আগামী ৫ বছর পর নিজেকে কোথায় দেখতে চান?

আমার আগামী ৫ বছর পরের পরিকল্পনা ভয়াবহ। আমি জানিনা সফল হবে কিনা। আপাতত, পরিকল্পনা অন্তত একটা সিনেমা বানানো। যেটি না করলে আসলে আমি এখন পর্যন্ত মানসিক শান্তিটা পাচ্ছিনা।

এর মধ্যে ইচ্ছে আছে একটা মাস্টার্স করা এবং সেটা হবে ক্রিয়েটিভ রাইটিং এর উপর। ক্রিয়েটিভ রাইটিং এর উপর ১-২ বছর পড়াশোনা ও নিবিড়ভাবে কাজ করতে চাই। আমাদের দেশে এই সেক্টরটা খুব নাজুক। হাতে গোণা ৫-৬ জন ভালো মানের স্ক্রিপ্ট রাইটার আছেন বাংলাদেশে। ভালো স্ক্রিপ্টিং এর অভাবে দর্শক বাংলা নাটক ও প্রোগ্রাম থেকে সরে আসছে। তাই এই সেক্টরটা নিয়ে প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনা ও দক্ষতা নিয়ে কাজ করতে চাই।
আরেকটা ইচ্ছা হল নর্থ আমেরিকা তে অন্তত একটি স্ক্রিপ্ট সেল করতে পারা। যদিও তারা নিবে কিনা জানিনা। ওরা সাধারণত বাইরে থেকে কোন কাজ নিতে চায় না। তবে আমার কেন জানি মনে হয় আমি এইটা পারব। জানিনা কেন মনে হয় তবে মনে হয়! দেখা যাক আল্লাহ্‌ কপালে কি রেখেছেন।

এখন পর্যন্ত আপনার করা শ্রেষ্ঠ কাজ কোনটা মনে হয়েছে এবং কেন ?


শ্রেষ্ঠ কাজ মনে হয় না এখনো করেছি। তবে বলার মত সবচেয়ে পছন্দের কাজ উন্মাদের জন্য আইডিয়া দেয়া।

তারপর হুমায়ূন স্যার এর “অতঃপর শুভ বিবাহ” নাটকে নিজের অভিনয়। ২০১৫ সালে বের হওয়া “কাব্য সংক্রান্তি” নামের নিজের ৫ম কবিতার বইটি।

এখন ভিএফএক্স এ কাজ করছি। এখানেও যে কাজ গুলো করেছি বা করছি এগুলোও গর্ব করার মতই। কাজগুলো খুবই চ্যালেঞ্জিং।

“ব্যাটম্যান বনাম সুপারম্যান” এ প্রায় দেড় বছর আমরা কাজ করেছিলাম। এটাও খুব চ্যালেঞ্জিং ছিল আসলে। তবে, সবগুলো কাজই গর্ব করার মতো কাজ। অনেক কিছু নতুন নতুন প্রযুক্তি আর কৌশল নিয়ে কাজ করতে হয়েছে। বিশাল বাজেটের কাজ ছিল এটা।

ক্যাপ্টেন আমেরিকাও খুব চ্যালেঞ্জিং একটা কাজ ছিল। খুব কম সময়ে কাজটা শেষ করতে হয়েছিল।
বলার মত, আরেকটি কাজের কথা না বললেই না, সেটা হল, একটা শর্ট ফিল্ম করি ফাইনাল ইয়ার এ থাকতে “হোয়াট এম আই ডুইং হিয়ার”। এটি একটি শর্ট ফিল্ম। 

গার্ডিয়ানস অব দ্য গ্যালাক্সি ২, ক্যাপ্টেন আমেরিকা: সিভিল ওয়ার’ ও ‘ডক্টর স্ট্রেঞ্জ এর মত এত ভাল ভাল ছবিতে কাজ করে আপনার অভিজ্ঞতা  এবং অনুভূতি  যদি আমাদের সাথে একটু শেয়ার করতেন।

এখন “গার্ডিয়ানস অব দা গ্যালাক্সি ২” তে কাজ করছি। কাজটা শেষ হবে মার্চ মাসে। এইটা খুবই কমপ্লেক্স একটা কাজ। যদিও তেমন কিছু বলার অনুমতি নেই। কিন্তু কাজটা আমাদের জন্য চ্যালেঞ্জিং এবং মজার।

ক্যাপ্টেন আমেরিকা তে কাজ করার ব্যাপারটা খুব মজার ছিল। তখন মাত্র আমরা ব্যাটম্যান বনাম সুপারম্যান এর কাজ শেষ করেছি। আর আমি ছোটবেলা থেকেই এই চরিত্রের সাথে পরিচিত। তাই এই চরিত্রটা ভালো লাগতো। খুব চাচ্ছিলাম এটা তে কাজ করতে। শুরুতে হেলিকপ্টার এর মারামারিটা আমাদের করা আবার শেষের দিকে ক্যাপ্টেন আমেরিকা ও আয়রন ম্যান এর মধ্যে একটা মারামারি হয় এই কাজটাও আমাদের করা।

Captain_America_The_First_Avenger_poster BvS Key Art 03 DrStrange_Credit

ডক্টর স্ট্রেঞ্জার এর শুরুর দিকে ওর যে সুপার পাওয়ার গেইন করার ইফেক্ট গুলো সেগুলো আমাদের করা। প্রচুর চ্যালেঞ্জ এর মধ্যে দিয়ে যেতে হয়েছিল। এমনও হয়েছে ৩ জন আর্টিস্ট ৩ মাস কাজ করার পর সেটা আবার চেঞ্জ করা হয়েছে। সেখান থেকে আবার নতুন করে কাজ করা লেগেছে। এইটা খুবই চ্যালেঞ্জিং ছিল আসলে। আর খুবই গর্বের ব্যাপার যে এটা সম্প্রতি অস্কার নমিনেশন পেয়েছে।

তিনটি সফটওয়্যার অথবা টুলস এর নাম বলুন যেটা নতুনদের সাহায্য করবে কাজ শিখতে।

সফটওয়্যার এর ব্যাপার টা আসলে ঠিক করতে হবে কে কোন দিকে কাজ করতে চায়। যেমন কেউ যদি 2D নিয়ে কাজ করতে চায় তাহলে তাকে ঠিক করতে হবে এই দিকের কোন পার্টটা তে সে দক্ষ হতে চায় ডিজাইন, মডেলিং নাকি অন্য কিছু। সে হিসেব করে সফটওয়্যার বা টুল বেছে নিতে হবে।

তবে সবদিক বিবেচনা করে কিছু সফটওয়্যার বিশ্বের সব জায়গায় ব্যবহৃত হয়। ভিএফএক্স এ 3D এর জন্য মায়া সফটওয়্যার টি বেশ আলোচিত। এখন অনেকে হুডিনি(HOUDINI)ও ব্যবহার করে। আর কম্পজিটিং এর জন্য আছে নুকে (NUKE)। আর 2D এনিমেশনের জন্য  টুনবুম (TOONBOOM) এবং এগুলোর পাশাপাশি ফ্ল্যাশ ব্যবহার হয় বেশি।

আপনার চোখে সর্বকালের শ্রেষ্ঠ ভিজুয়্যাল আর্টিস্ট কে? যাকে দেখে আপনি অনুপ্রাণিত হন।

আমার একজন সুপারভাইজার ছিলেন ব্যাটম্যান বনাম সুপারম্যান এ কাজ করার সময়। তার নাম হচ্ছে গিয়ম। আমার সৌভাগ্য তার সাথে কাজ করার সুযোগ হয়েছে। ফ্রেঞ্চ এই ভদ্রলোক মাত্র ৩০ বছর বয়সে লাইফ অফ পাই এর জন্য অস্কার পায়। তার প্রতিটা কাজ এতোটা নিখুঁত যে আসলেই অকল্পনীয়। সে জানতো, প্রতিটা কাজের ডিটেল সম্পর্কে। এ গুণটা অনেকের মধ্যে থাকে না। 

ডক্টর স্ট্রেঞ্জার এ কাজ করেছি আমার আরেক সুপারভাইজার । তার নাম হচ্ছে চ্যাড

সে এতো ভালোভাবে কাজগুলো গুছিয়ে করতে পারে যে অসাধারণ। সে ক্রিয়েটিভ কাজের পাশাপাশি ব্যবস্থাপনায় এতো ভালো যে, আমি ওর মতো আর কাউকে দেখি নাই। আমাদের কাজ গুলো সহজ করে দিত। এখন সে থর মুভি টার জন্য কাজ করছে। মেথড ছেড়ে আইএলএম এ জয়েন করেছে। 

আপনার কাজের স্থানটি কেমন ?

সত্যি কথা বলতে গেলে একটু মেসি।

আসলে অফিস একটি বিশাল ওয়্যার হাউস প্রায় ১০,০০০ স্কয়ার ফিট যেখানে একসাথে সব মিলিয়ে ৫০০ জন আর্টিস্ট আর প্রোডাকশন এর লোক কাজ করে। সবাই ঢালাও ভাবে ফ্লোর এ বসে কাজ করে। আমার প্রডিউসার, লাইন প্রডিউসার, সুপারভাইজার আর আমি একটা আলাদা রুম এ বসে কাজ করি।

Captain America Crew

Captain America Crew

ডিজাইনের ক্ষেত্রে প্রয়োজন পরে এমন টুলস বা সফটওয়্যারের নাম বলুন যেটি ছাড়া আপনার চলা প্রায় অসম্ভব এবং কেন?

প্রোডাকশন ম্যানেজার হিসেবে আমাদের বিভিন্ন শট ম্যানেজ করতে হয়। এটি খুবই সময় সাপেক্ষ ব্যাপার। এজন্য আমরা শটগান সফটওয়্যারটি ব্যবহার করে থাকি। শটগান সফটওয়্যার ছাড়া আমরা অচল আসলে।

কাজ করার সময় আপনি কোন ধরনের গান শুনতে পছন্দ করেন?

পুরনো বাংলা ব্যান্ড এর গান। কিছুক্ষণ আগেও আমি সোলস আর মাইলসের গানগুলো শুনছিলাম।

আপনার জীবনের টাইম সেভিং শর্টকাট অথবা লাইফ হ্যাক কি?

কিছু কাজ আমি খুব দ্রুত করতে পারি। সিদ্ধান্তের ব্যাপারে আমি খুব সহজেই সিদ্ধান্ত নিতে পারি। আর, পোশাক আশাক, খাবার দাবার আর শপিং এ আমি খুবই কম সময় দেই। এসব কাজে সময় নষ্ট করার কোন মানে হয় না আসলে।   

প্রতিদিনের টু-ডু লিস্ট তৈরি করার জন্য কোন সফটওয়্যার/পন্থাটি আপনার কাছে সেরা মনে হয়?

ফোনে নোট প্যাড সফটওয়্যারটা বেশী ব্যবহার করি। লিস্ট করে রাখি একটা একটা করে কাজ শেষ হয় আর ওইটা ক্রস দিয়ে রাখি।

একজন বাংলাদেশি হিসেবে যানজট আমাদের নিত্য দিনের সঙ্গী। আপনি যানজটের সময়টাকে সদ্ব্যবহার করার জন্য কী করেন?

যানজটের ভয়াবহতার কারণে আমি গত কয়েকবার দেশে যাওয়ার পর উত্তরা যাওয়া বন্ধ করে দিয়েছি।

আমি যখন দেশে ছিলাম তখন দাঁত মাজা থেকে শুরু করে নাস্তা খাওয়া সব করতাম যানজট এ বসে বসে। অনেকটা মিঃ বিন এর মত। এখন যেটা হয়, ফেইসবুকটা ব্যবহার করা হয়। ভাগ্য ভালো যে, ফেইসবুক ছিল।

আপনার মোবাইল এবং কম্পিউটার ছাড়া এমন কী ডিভাইস ব্যবহার করেন যেটা ছাড়া আপনি থাকতে পারবেন না?

আমার একটি প্লেষ্টেশন-৪ আছে যেটা ছাড়া আসলে আমি থাকতে পারিনা। কারণ, আমি অনেক গেইমস খেলি।  

দিনের ঠিক কোন সময়ে আপনি খুব মনোযোগ দিয়ে কাজ করতে পারেন?

রাত ১২ টার পর। এ সময়ে আমার মত মনোযোগ দিয়ে আর কেউ কাজ করতে পারে না।

আপনার দৈনিক ঘুমানোর সময়সূচি কেমন?

৮ ঘণ্টা ঘুমাতে পারলে আমার খুবই ভালো লাগে। কিন্তু সেটা কখনোই পারিনা। এখন ৬-৭ ঘণ্টার বেশী ঘুমানো হয় না আসলে। ১২ টার দিকে ঘুমাই সকাল ৭ টার দিকে উঠে যাই।

প্রতিদিন আপনার কাছে এমন কী মনে হয়, যে আপনি সবার থেকে আলাদা ?

আসলে আমরা প্রতিটা মানুষ নিজেদের মত আলাদা। এবং আমরা সবাই এই মহা বিশ্বের এক একটি উপাদান। কাউকে ছাড়াই পুরো ব্যাপারটা অসম্পূর্ণ। আমরা সবাই খুব গুরুত্বপূর্ণ আসলে। হুমায়ূন আহমেদ স্যার খুবই চমৎকার করে বলতেন যে, আমরা প্রতিটা মানুষই অসাধারণ।

আপনার কাছে গুণীজনদের কাছ থেকে পাওয়া এখন পর্যন্ত সেরা উপদেশ কোনটি মনে হয়েছে?

এখন পর্যন্ত সবচেয়ে সেরা উপদেশ আমি পেয়েছি হুমায়ূন আহমেদ স্যার এর কাছ থেকে। উনি সব সময় বলতেন,

পাঠক অথবা দর্শক কে কখনো বোকা ভাবা যাবে না। কারণ, তারা তোমার সৃষ্টিকে পড়ছে বা দেখছে তার মানে তারা তোমাকে সম্মান দিচ্ছে। তাদেরকেও তোমার সম্মান দেখাতে হবে, তাদের জন্য মান সম্মত কিছু সব সময় দিতে হবে। পাঠকের বা দর্শকের ক্ষমতা অসীম। তারা ততদিনই তোমার সৃষ্টি কে ভালবাসবে যতদিন তুমি সততার সাথে তাদের কে ভালো কিছু উপহার দিতে পারবে।  

তিনটা বই এবং চলচিত্র নাম আপনি মনে করেন সব ভিজুয়্যাল আর্টিস্ট   দের পড়া এবং দেখা উচিত?

একজন ভিজুয়্যাল আর্টিস্টদের বইয়ের ব্যাপারটা আমার জন্য বলাটা কঠিন। তবে চলচ্চিত্রের মধ্যে “শট বাই শট” এর কথা উল্লেখযোগ্য। তাছাড়া, স্টার ওয়ারস, গড ফাদার, লর্ড অব দা রিংস এই ট্রিলজি গুলো আমি প্রায়ই দেখি। আমার জন্য এগুলো ইন্সপায়ারিং।  

তবে একজন ভালো রাইটার হবার পিছনে আমার বই পড়াটা অনেক উৎসাহ দিয়েছে। ভালো কিছু চিন্তা করতে, ভালো গল্প বলতে ও লিখতে বই পড়ার বিকল্প নেই। সে ক্ষেত্রে আমি কিছু বই এর নাম বলতে চাই – “যারা বৃষ্টিতে ভিজেছিল” – জয় গোস্বামী, “যে জলে আগুন জ্বলে” – হেলাল হাফিজ, হুমায়ূন স্যার এর “কবি”।

পাশাপাশি আর্টিস্টদের গ্রাফিক্স নভেলগুলো পড়া উচিত। ফ্রেমিং এবং কম্পোজিশনের বেশ ভাল ধারনা পাওয়া যায়।

যেকোনো জটিল পরিস্থিতিতে নিজের কাজ করার মন মানসিকতা ঠিক রাখার জন্য আপনি কী করেন?

এই ধরনের পরিস্থিতিতে আমি আসলে প্রচুর খাওয়া দাওয়া করি। আর যে কাজ গুলো আমি করি সেগুলো হলো, প্রচণ্ড জোড়ে গান ছাড়ি আর গান গাই, পছন্দের খাবার দাবার খাই, কার্টুন দেখি, গেমস খেলি, নিজের গীটার এ টুং টাং করি।  

যারা ভবিষ্যতের ভিজুয়্যাল আর্টিস্ট  অথবা ফিল্ম মেকার  হতে যাচ্ছে তাদেরকে আরও উৎসাহিত করতে আপনার উপদেশ কী হবে? ঠিক কিভাবে কাজ করলে তারাও একদিন আপনার মতো হতে পারবে?

এখন যারা ফিল্ম মেকার আছে বা হতে চাচ্ছে তাদের এখন কাজ করার উপযুক্ত সময়। কারণটা হল, আমাদের সময় সঠিক কোন গাইড ছিল না, শেখার সুযোগ ছিল না। এখন কিন্তু সেই বাঁধা গুলো একদম নেই। ইন্টারনেট এর মাধ্যমে উন্নত দেশের ছেলেমেয়েরা যেটা শিখতে পারছে আমাদের দেশের ছেলেমেয়েরাও একই জিনিস শিখতে পারছে। তাই, শেখার ব্যাপারটা একদমই সহজলভ্য হয়ে গেছে। নিজের হাতের ফোন দিয়েই সহজেই একটু শর্ট ফিল্ম বানানো যায় আবার সেই বানানো শর্ট ফিল্ম সহজেই ইউটিউব এ দিয়ে দেয়া যায়।

তবে, নতুনদের জন্য একটা কথাই বলার আছে, যেহেতু শেখার ব্যাপারটা এখন সহজ হয়ে গেছে তাই গল্পটা সুন্দর না হলে কিন্তু দর্শকদের ধরে রাখাটা সহজ হবে না। গল্পটা সুন্দর করতে হবে। গল্প সুন্দর না হলে যতই প্রযুক্তির ব্যবহার করি না কেন সেটার সাড়া ভালো হবে না কখনোই।

শূন্যস্থান পুরন করুন, আমি এই একই প্রশ্নের উত্তর গুলো  ______  কাছ থেকে শুনতে পছন্দ করব।

জাগো ফাউন্ডেশন এর করবী ভাই।

Shares